Image default
বাংলাদেশ

ইউটিউব দেখে মুক্তা চাষে সফল উদ্যোক্তা

যশোরের অভয়নগর উপজেলার একতারপুর গ্রামে বাড়ির ছাদে মুক্তা চাষ করে সফলতা পেয়েছেন কলেজশিক্ষার্থী আব্দুর রহমান। পাশাপাশি বাড়ির ছাদে রঙিন মাছ চাষ করেছেন। সেইসঙ্গে এ আর এগ্রো ফার্মিং মুক্তা চাষ ট্রেনিং সেন্টার খুলে অনেক যুবককে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করে দিয়েছেন। এখন প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকার মুক্তা বিক্রি করেন তরুণ এই উদ্যোক্তা। চলতি বছর নওয়াপাড়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন তিনি। 

যেভাবে শুরু

আব্দুর রহমান জানান, করোনা মহামারির সময়ে বাড়িতে বসে পড়াশোনার পাশাপাশি অলস সময় কাটতো। বাড়ির বাইরে যেতে পারতেন না। এ সময় ইউটিউবে ঝিনুক থেকে মুক্তা চাষের পদ্ধতি দেখে উদ্বুদ্ধ হন। এরপর এ নিয়ে কিছুদিন গবেষণা করেন। প্রথমদিকে পরীক্ষামূলক দুটি ঝিনুক দিয়ে মুক্তা চাষে সফলতা পান। পরে ৫০০ ঝিনুক নিয়ে কাজ শুরু করেন। ২০২২ সালে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নেন। অভিজ্ঞতা অর্জনে নওগাঁ ও কোটচাঁদপুরের কয়েকটি ফার্ম পরিদর্শন করেন। ২০২২ সালের শেষের দিকে এ আর অ্যাগ্রো ফার্ম নাম দিয়ে মুক্তা চাষে নেমে পড়েন।

বাড়ির ছাদে হাউস তৈরি

আব্দুর রহমান বাড়ির ছাদে ২০ ফুট বাই ১০ ফুট একটি পানির হাউস তৈরি করেছেন। সেখানে মুক্তা চাষ করেন। পাশাপাশি ছোট ছোট কিছু রঙিন মাছ ফেলেছেন। মুক্তার বাইরের কালো আবরণ তুলে সেটা গলিয়ে পাউডার ও আঠা দিয়ে ২৯ প্রকার পিতলের ডিভাইসের মাধ্যমে নিউক্লিয়াস (ইমেজ) তৈরি করেন। ১২ ঘণ্টা পরে নিউক্লিয়াস মেশিনের মাধ্যমে কেটে সুন্দর করা হয়।

মুক্তা যেভাবে তৈরি হয়

ভালো ও সুস্থ দেড় থেকে দুই বছর বয়সী ঝিনুক সংগ্রহ করেন আব্দুর রহমান। সেগুলো ছাদের হাউসে রাখা হয়। ডিজাইন (নিউক্লিয়াস) সিলেক্ট ও নেট প্রস্তুত করা হয়। পানি থেকে তুলে তা অপারেশনের মাধ্যমে ডিজাইন করে পানিতে অ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে একদিন রাখা হয়। এরপর ১০টি ঝিনুক পানির দেড় ফুট গভীরে ভাসমান অবস্থায় রাখা হয়। এভাবে সাত-আট মাস রাখার পর ঝিনুক থেকে ডিজাইনযুক্ত মুক্তা সংগ্রহ করতে পারেন।

মুক্তার বাজার

আব্দুর রহমান বলেন, ‘মূলত তিনটি গ্রেডের মুক্তা পাই। এগুলো হলো—এ, বি ও সি গ্রেড। ডিজাইনভেদে পাইকারি এ গ্রেডের মুক্তা ৫০০-৬০০ টাকা, আর বি ও সি গ্রেডের মুক্তা এর চেয়ে একটু কম দামে বিক্রি হয়। আমার উৎপাদিত মুক্তা সর্বনিম্ন ৭০-৮০ টাকা আর সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করছি। যেসব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ডিজাইনের কাজ করে তারা মুক্তা কিনে নেয়। একবার দুই লাখ টাকার মুক্তা বিক্রি করেছি। ওসব মুক্তা তৈরি করতে সবমিলিয়ে ৩০-৪০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছিল।’

ফার্মে ২০ জনের কর্মসংস্থান

আব্দুর রহমানের ফার্মে বাবা ছাড়াও সহায়ক হিসেবে কাজ করছেন ১৯ জন কর্মী। এর মধ্যে ঝিনুক সংগ্রহের কাজে পাঁচ, নিউক্লিয়াস তৈরিতে পাঁচ, মুক্তায় ডিজাইন করার জন্য দুই এবং নেট তৈরিতে সাত জন কর্মী কাজ করছেন। দিনে কর্মীদের ৪০০-৫০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়।

বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে আব্দুর রহমানের বোনের বাড়ি অভয়নগর উপজেলার নাউলী গ্রামের একটি পুকুরে সাড়ে তিন হাজার ঝিনুক এবং ছাদের ওপরে নির্মিত হাউসে তিন হাজার ঝিনুক রয়েছে। হাউসের ঝিনুক অপারেশন করে রাখা হয়েছে। এতে ঝিনুকের পাশাপাশি রঙিন মাছের চাষ করেও মাসে তিন হাজার টাকা আয় করেছেন।

আব্দুর রহমান বলেন, ‘নতুন কিছু করার চেষ্টা থেকে ইউটিউব দেখে মুক্তা ও রঙিন মাছ চাষ শুরু করেছিলাম। এখন দেশের নামকরা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে গোল ও ডিজাইন করা মুক্তা সরবরাহ করি। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছি। সরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে মুক্তা ও রঙিন মাছের খামার আরও বড় করতে পারবো। এতে অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।’

দেশের বাইরে এখনও মুক্তা পাঠানো হয়নি উল্লেখ করে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘ভারতের বাজারে এর চাহিদা রয়েছে প্রচুর। বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। ভবিষ্যতে বিদেশে পাঠাবো মুক্তা।’

কলেজশিক্ষার্থী আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমানের বাবা আকিজ জুট মিলের শ্রমিক কবির হোসেন বলেন, ‘একসময় ছাদের হাউসে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ করতাম। প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ করে মাসে চার কেজি শৈবাল সংগ্রহ করেছি। বিক্রি করতাম চার হাজার টাকা কেজি দরে। পরে সেটি চাষ করতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাদ দিই। সামুদ্রিক শৈবাল হৃদরোগীরা ব্যবহার করতেন। পরে ছেলের মুক্তা চাষ দেখে সহায়তা করি। এখন আমরা স্বাবলম্বী।’

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আব্দুর রহমান অনুকরণীয়

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অভয়নগর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কুমার ঘোষ বলেন, ‘যারা বেকার বসে আছেন, তারা আব্দুর রহমানের ফার্মটি দেখতে পারেন। এ নিয়ে কাজ করলে দ্রুত স্বাবলম্বী হতে পারবেন। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আব্দুর রহমানের মতো উদ্যোক্তা অনেকের কাছে অনুকরণীয়।’

তিনি বলেন, ‘উপজেলা মৎস্য অফিসের মাধ্যমে তাকে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ধরনের কার্যক্রমে আমরা পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকি।’

Source link

Related posts

লাইভে এসে ক্ষমা চাইলেন মামুনুল

News Desk

‘এবারের ভোট ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার হবে, আমার কাছে নৌকার প্রার্থী হারবে’

News Desk

রাজশাহী মেডিকেলে ২৪ ঘণ্টায় ১৩ জনের মৃত্যু

News Desk

Leave a Comment