free hit counter
মৃত্যুর পরও আপনি যখন বেঁচে আছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়
জানা অজানা

মৃত্যুর পরও আপনি যখন বেঁচে আছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়

প্রিয়জনের মৃত্যুর পর স্মৃতিটুকু ছাড়া থাকে না আর কিছুই। কিন্তু সত্যিই কি তাই? প্রযুক্তি কিন্তু বলছে, ই-মেল, চ্যাট, সোশ্যাল মিডিয়ার ফেলে যাওয়া তথ্যসম্ভার দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে মৃত মানুষটির আর এক সত্তা!অরুণোদয় কুণ্ডু

‘তোমার আত্মার শান্তি কামনা করি দাদু। যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।’ নাতির সোশ্যাল মিডিয়ার এ হেন পোস্টের নীচে প্রথম কমেন্ট, ‘আমি খুব ভালো আছি দাদুভাই। সকলে আমার আশীর্বাদ নিও’। কমেন্ট করেছেন স্বর্গত দাদু নিজেই!

নাহ, এটা কোন ভূতের গল্প নয়। ভেলকিবাজি মনে হলেও হয়তো এটাই হতে চলেছে আমাদের ভবিষ্যৎ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাত ধরে মৃত মানুষকে পুনরুজ্জীবিত করা যাবে বলে জানাচ্ছেন সাইবার দুনিয়ার রথী-মহারথীরা। রেলওয়ে অ্যাপের দিশা বা ওকে গুগল বলার সাথে সাথে সজাগ হয়ে যাওয়া চ্যাটবটগুলোর মতো মৃতব্যক্তির প্রোফাইলগুলোও জেগে উঠবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জীয়নকাঠির ছোঁয়ায়। উত্তর দেবে সমস্ত মানুষের প্রশ্নের। শুধু তাই নয়, যে ধরনের পোস্ট বা কমেন্ট মানুষটা বেঁচে থাকার সময় করতেন, তার সবটুকুই করবে এই অভূতপূর্ব চ্যাটবটগুলো। তাঁর পছন্দ-অপছন্দ, আবেগ-অনুযোগ সব কিছুই হুবহু ফিরবে সাইবার দুনিয়ায়। ফিরবে জীবিতকালে ইন্টারনেটে ফেলে যাওয়া চ্যাট, ছবি, পোস্টের হাতধরে। মেশিনলার্নিং আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অসাধ্য-সাধনে তৈরি এ রকম একটি চ্যাটবটের পেটেন্ট ২০১৭ সালেই নিয়েছে মাইক্রোসফট। যা শুধু চ্যাটের উত্তর বা ডিজিটাল দুনিয়ার নানা কাজেই ক্ষান্ত থাকবে না। ভয়েসকলে কথাও বলতে পারবে। তাই যিনি জানেন না যে ওই ব্যক্তি মৃত, তিনি ফোনে টেরও পাবেন না যাঁর গলার কথা শুনছেন, সেই রক্তমাংসের মানুষটা আসলে নেই! এই প্রযুক্তির কাজ শুরু হলেও এখনই এটি বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করার মতো পরিকল্পনা মাইক্রোসফটের নেই। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে এটাই হয়ে উঠতে পারে চিরকালের মতো হারানো প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার পথ।

তবে তাতে নানারকম আইনি জটিলতা এবং অপব্যবহারের সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বিশেষজ্ঞরাই। কারণ, এই কৃত্রিম ডিজিটাল চরিত্র নির্মাণে যা সকলের আগে দরকার, তা হল মানুষটির ব্যক্তিগত তথ্যসম্ভার। আর এখানেই আইনের ফাঁস শুরু। সাইবার দুনিয়ায় নানা কাজে আমরা এগিয়ে গেলেও, একজন মানুষের মৃত্যুর পর ইন্টারনেটে তাঁর ফেসবুক, ই-মেল ইত্যাদি অ্যাকাউন্টের গোপন তথ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে এ যাবৎ সে ভাবে কোনও আইনই তৈরি হয়নি। আর সেটাই এই চ্যাটবটের বাস্তবায়নের পিছনে সবথেকে বড় বাধা। এ ধরনের প্রযুক্তির কাজ একা মাইক্রসফট করছে না। এই প্রয়াসে উদ্যোগী অনেক তাবড় সংস্থা। একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংস্থা আরও একধাপ এগিয়ে ব্যবহার করছে মানুষটির ভৌগোলিক অবস্থান, দিনের বিভিন্ন সময়ের গতিবিধি, কোনও ভাবে রেকর্ড হওয়া তাঁর অডিয়ো-ভিস্যুয়াল তথ্যও, যা দিয়ে পরিবারের অনুমতি নিয়ে বানিয়ে ফেলা যাবে মানুষটির হুবহু একটি অবতার! তখন আর মরা মানুষকেও মৃত বলার সুযোগ থাকবে না।

এই কারণেই, মৃত মানুষের গোপন তথ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা থাকার দরকারটা জোরালো হয়ে উঠছে দিনে দিনে। এ রকমই মতপ্রকাশ করেছেন মিডিয়া আইনের লেকচারার এডিনা হারবিঞ্জা। তাঁর মতে, জাতীয় আইনগুলো মৃত মানুষের পোস্টমর্টেম, ডেটা বা ইন্টারনেটে ফেলে যাওয়া তথ্যের ব্যাপারে উদাসীন। যদিও ইতালি, ফ্রান্সের মতো দেশগুলো এ ব্যাপারে আইন এনেছে ইতিমধ্যেই। কিন্তু ব্রিটেনের মতো দেশেও এ নিয়ে কোনও আইন নেই। ব্যাপারটা আরও জটিল হওয়ার কারণ আমাদের সমস্ত ডিজিটাল তথ্য থাকে গুগল ফেসবুকের মতো কিছু বেসরকারি সংস্থার কাছে। আর সে সবের মালিকানা আমরা অ্যাকাউন্ট খোলার সময় টার্মঅ্যান্ডকন্ডিশন মেনে তুলে দিয়েছি ওয়েবসাইটের হাতে। কিন্তু মৃত্যুর পর তথ্যের মালিকানার ব্যাপারে কোনও কথাই ওই নিয়মাবলীতে থাকে না। তাই এই নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। যেমন হয়েছিল ২০০৫ সালে মার্কিন নেভির একজনের মৃত্যুর পর। বিচারপতির অনুরোধের আগে তাঁর ই-মেলে ঢুকতে দেয়নি ইয়াহুমেল। যদিও এ সব মাথায় রেখেই গুগল ইন-অ্যাক্টিভ অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার বা ফেসবুক লেগেসি কন্ট্যাক্টের মতো অপশনগুলো আসছে সাইবারদুনিয়ায়, তবুও এই বিষয়ে আরও আইনি ঘেরাটোপের প্রয়োজন রয়েছে। অনেকটা মরণোত্তর অঙ্গদান বা দেহদানের মতো ডিজিটাল তথ্যদানটাও এ বার হয়ে উঠতে পারে ট্র্যাডিশন।

সে ক্ষেত্রে তথ্যের অপব্যবহার বা সেই সংক্রান্ত সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে। হয়তো এমন দিন আর খুব বেশিদূরে নেই যখন কোনও ওয়েবসাইট বিজ্ঞাপন দেবে, ‘আপনার প্রিয়জনকে চিরকালের জন্য বিদায় জানান, অথবা মূল্যের বিনিময়ে বাঁচিয়ে রাখুন ডিজিটাল দুনিয়ায়।’