Image default
জানা অজানা

পানি ছাড়া কি আসলেই বেঁচে থাকা সম্ভব?

মানুষ এক চমৎকার সৃষ্টি। সৃষ্টির সেরা বলা যায় যাকে। সে সুউচ্চ পর্বতশ্রেণী পদদলিত করতে পারে। বেঁচে থাকতে পারে কঠিন আর নির্দয় সব পরিস্থিতির মাঝেও। কিন্তু এরপরেও একটা অনিশ্চিত জীবন যাপন করতে হয় আমাদের সবাইকে। এমন জীবন যেটা পানি, খাবার এমনকি ঘুমের মতো সহজ ব্যাপারগুলোর অভাবেও শেষ হয়ে যেতে পারে! ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত আর মানতে কষ্ট হয় এমন ব্যাপার, তাই না?

প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করা উচিত

পানির আল্লাহর নিয়ামাতের মধ্যে অন্যতম। পানি ছাড়া মানুষের জীবনধারণ অসম্ভব। আল্লাহ তাআলা পানিকে মানুষের জন্য নিয়ামাত হিসেবে দান করেছেন। কেননা পৃথিবীর সকল প্রাণের উৎস পানি এবং সবাই পানির উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তাআলা পানিকে শুধুমাত্র মানুষের পান করার চাহিদা মিটানোর জন্যই তৈরি করেননি। পানিকে করেছেন সৃষ্টির বিভিন্ন কাজের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।

বিজ্ঞান আর উদাহরণ বলে, একজন মানুষ খাবার ছাড়া তিন সপ্তাহের বেশি টিকে থাকতে পারে। মহাত্মা গান্ধীর কথাই ধরুন, ২১ দিন কোন প্রকার খাবার ছাড়া বেঁচে ছিলেন তিনি৷ কিন্তু পানি সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।

একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের শরীরের গড়ে ৬০-৭০ ভাগ হচ্ছে পানি৷ এদিকে ঘাম, প্রস্রাব, মল, এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে আমাদের শরীর পানি হারায়। চূড়ান্ত বা ভারী ব্যায়ামের সময় ঘামের মাধ্যমে আমাদের শরীর থেকে ঘন্টাপ্রতি দেড় লিটার পর্যন্ত পানি বেরিয়ে যেতে পারে। তখন পানি ও খাদ্য (আমাদের শরীরে প্রবেশ করা পানির তিনভাগের একভাগ খাবারের মাধ্যমেই আসে কিনা!) গ্রহণের মাধ্যমে সেই পানির ক্ষতিপূরণ করতে হয় আমাদের। আর এটা যদি না করতে পারি, শরীর পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হতে পারে। রক্তচাপ কমে যেতে পারে। তারপর ঘাম বেরুনো বন্ধ। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া। সেই তাপমাত্রা কমাতে গিয়ে আরও পানিশূন্যতা। তারপর এভাবে চলতে চলতে হয়ত কয়েক ঘন্টার মাঝেই মৃত্যু।

পানি ছাড়া কি আসলেই বেঁচে থাকা সম্ভব?

জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের প্রফেসর রেন্ডাল কে. প্যাকারের মতে,

পানি ছাড়া সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ টেকা যায়।

মানুষের জীবনের শেষ দিনগুলোতে যখন তাদের খাদ্য ও পানি গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়, তা লক্ষ ও পর্যালোচনা করে এই হিসেবটা করেছিলেন প্যাকার।

কিন্তু এক সপ্তাহের হিসাবটা একটু বেশি বলে ফেলা হয়ে যায়। কারণ প্যাকারের গবেষণা ছিলো বৃদ্ধ আর অনেকটা কর্মক্ষমতা হারানো লোকদের নিয়ে। যাদের বেশিরভাগই ঘরে বিছানায় শুয়ে বসে থাকতেন। তরুন আর কর্মক্ষমদের বেলায় তা একই হওয়ার কথা নয়। তাই না? তিন অথবা চারদিন এক্ষেত্রে আরেকটু বিশ্বাসযোগ্য ও মেনে নেয়ার জন্য সহজ। বিশেষ করে পরিবেশ যদি হয় বর্তমান আবহাওয়ার মতো ফুটন্ত গরম।

ডিউক ইউনিভার্সিটির ক্লড পিয়ান্টাডোসি বলেন,

“বাইরের স্বাভাবিক বা গড় তাপমাত্রায় ১০০ ঘন্টা পর্যন্ত আপনি পানি ছাড়া টিকে থাকতে পারবেন। যদি তাপমাত্রা ঠান্ডা হয়, সময়টা আরেকটু বাড়বে। কিন্তু আপনি যদি সরাসরি সূর্যের আলো বা রোদের মাঝে থাকেন, তাহলে টিকবেন আরও কম সময়।”

পানিশূন্যতা সৃষ্টি করতে পারে নানারকম শারীরিক সমস্যা

সাইন্টিফিক আমেরিকানে লেখা এক আর্টিকেলে জীববিজ্ঞানের প্রফেসর প্যাকার লিখেছেন, “চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ প্রতি ঘন্টায় ১ থেকে ১.৫ লিটার পরিমাণ পর্যন্ত ঘামাতে পারে। আর শরীর থেকে হারিয়ে যাওয়া এই পানির পরিমাণ যদি পূরণ না করা হয়, পুরো শরীরের পানির মাত্রা খুব দ্রুত হ্রাস পেতে পারে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে রক্তচাপ কমে যেতে পারে এতে।”

শুনতে যেমনই হোক পানিশূন্যতা কিন্তু হালকা কোন ব্যাপার নয়। অগ্রাহ্য করার মতো তো অবশ্যই নয়। মৃদু পানিশূন্যতাও দুর্বল করে দিতে পারে একজন মানুষকে। তারপর ঘটে ক্রমিক কিছু ঘটনা- প্রথমত রক্ত ঘন হতে শুরু করে। চলাচলে বাধাগ্রস্থতা তৈরি হয়। এসময় শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ’গুলো রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখার ব্যর্থ কিন্তু জোর প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কিডনি পানির ক্ষতিপূরণ করতে গিয়ে প্রস্রাব উৎপন্ন করা বন্ধ করে দেয়। শরীরের কোষগুলো সব রক্তপ্রবাহে পানি সরবরাহের চেষ্টা করে। ফলে সংকুচিত হয়ে যায় সেগুলো। এভাবে যখন পানির অভাবে শরীরের ৪ ভাগ ওজন হারাই আমরা, তখন রক্তচাপ কমে যায় দ্রুত। জ্ঞান হারানোর ঘটনা ঘটে এরপর।

ফ্লুইড ও ইলেক্ট্রোলাইট নিয়ে গবেষণারত গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল সার্জারির প্রফেসর দীলিপ লোবো বলেন, “আপনার শরীর রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। টিকে থাকার জন্য তখন এটা কম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে রক্ত সরবরাহ ধীর করে দেবে। যেমন আপনার নাড়িভুড়ি, কিডনি। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হয় এরা। কিডনি যদি আপনার রক্ত ফিল্টার করতেই না পারে, কোষের বর্জ্য পদার্থ বাড়তে থাকবে। আর তখন আক্ষরিক ভাবেই স্রেফ এক গ্লাস পানির জন্য মারা যাচ্ছেন আপনি।”

শরীরের প্রয়োজনীয় পানির তিনভাগের একভাগ খাবারের মাধ্যমে পাই আমরা

পানির একটা অংশ খাবার থেকে পাই আমরা। কিন্তু সরাসরি পানি করাটা হতে হবে মূল উৎস। অবশ্য পরিষ্কার, নিরাপদ এবং বিশ্বস্ত কোন জলাধারের হতে হবে সে পানি। হতে হবে সঠিক নিয়ম মেনে পানের উপযোগী করা। অন্যান্য পানীয় যেমনঃ দুধ, ফলের রস এগুলোও আমাদের শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে হ্যাঁ, দেখতে যতোই তরল আর আকর্ষণীয় রঙের হোক না কেন এই তালিকায় এলকোহল রেখে বসবেন না যেন! এটা শরীরকে স্বাভাবিকের চাইতে বেশি পরিমাণ পানি হারাতে বাধ্য করে। অন্য সব ক্ষতিকর দিক তো আছেই।

ইনস্টিটিউট অফ মেডিসিন এর মতে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের প্রতিদিন ১০১ আউন্স পানি পান করা উচিৎ। যা পরিমাণে ১৩ কাপ বা তার চাইতে কিছুটা কম। আর একজন নারীর উচিৎ ৭৪ আউন্স বা ৯ কাপের চাইতে কিছুটা বেশি পানি পান করা। ৪ ও ৮ বছরের মাঝে থাকা শিশুদের জন্য প্রতিদিনের পানির পরিমাণ ৪০ আউন্স কিংবা ৫ কাপ। ৯ ও ১৩ বছরের মাঝের বয়সীদের জন্য সেটা বেড়ে হবে ৫৬-৬৪ আউন্স বা ৭-৮ কাপ। আর ১৪ ও ১৮ বছরের মাঝে থাকা ছেলেমেয়েদের জন্য ৬৪-৮৮ আউন্স। যা পরিমাণে ৮-১১ কাপ হয়।

অতএব পানি পান করুন, পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন। হাতের কাছেই রাখুন পানির সহজলভ্য একটা উৎস। পানিশূন্যতা থেকে বাঁচতে হবে তো। আর বর্তমান আবহাওয়ায় তো কথাই নেই। যা গরম পড়ছে আর যেভাবে ঘামাচ্ছে মানুষজন, কিছুক্ষণ পরপর বরফ শীতল এক গ্লাস পানি তো শুধুমাত্র পানি নয়। যেন স্বর্গের একটা টুকরো। তাই না?

Related posts

নেদারল্যান্ডসের গিয়েথুর্ন ভিলেজ – কোনও রাস্তা নেই, গাড়ি নেই, যাতায়াত মাধ্যম নৌকা

News Desk

অস্ট্রেলিয়ান ব্যক্তি তার গাড়ি চুরি করা চোরকে থামাতে ফর্কলিফ্ট ব্যবহার করেন

News Desk

সভ্যতার ১২টা বাজতে আর ১০০ সেকেন্ড

News Desk

Leave a Comment