free hit counter
জানা অজানা

চোখ যে মনের কথা বলে : চোখের রঙে কি মানুষ চেনা যায়!

“চোখ যে মনের কথা বলে”, বিখ্যাত এই গানের লাইন থেকেই বোঝা যায় চোখ নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। কবিতা, গান, গল্প সবকিছুতেই চোখের সৌন্দর্য্যের রয়েছে একটি আলাদা ভালো লাগার জায়গা। চোখের সৌন্দর্য্য কয়েকগুণ বেড়ে যায় যদি চোখের রঙ একটু অন্যরকম হয়। এ্যামা স্টোন থেকে ঐশ্বরিয়া রায় বচ্চন, নামীদামী অনেক সেলেব্রিটিরই প্রাকৃতিকভাবে চোখের রঙের ভিন্নতা রয়েছে, সেলেব্রিটি ছাড়াও সাধারণ মানুষের মাঝেও যে এমনটি খুঁজে পাওয়া যায়না তা কিন্তু নয়। আমাদের দেশের মানুষজনের বেশিরভাগেরই চোখের রঙ হয় কালো কিংবা গাঢ় বাদামি। তাই ভিন্ন রঙের চোখের অধিকারীরা সহজেই নজর কেড়ে নেয় আমাদের। এশিয়ানদের মাঝে চোখের বর্ণের এতো ভিন্নতা দেখা না গেলেও পাশ্চাত্যে এর অধিকতা দেখা যায়। চলুন জেনে নেয়া যাক ভিন্ন বর্ণের চোখের পেছনের কারণটি।

চোখ, প্রাণীর আলোক সংবেদনশীল অঙ্গ ও দর্শনেন্দ্রীয়। চোখেরই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের নাম আইরিশ। এটি চোখের রঙিন অংশ যা আংটি বা রিং এর মত দেখতে। আইরিশ বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে, বাদামি, সবুজ, নীল ইত্যাদি। আইরিশের ভেতরে মেলানিনের পিগমেন্টেশনের কারণে চোখের বিভিন্ন রঙ হয়। মেলানিন এর পিগমেন্টেশন যতো বেশি হয় আইরিশের রঙ ততো গাঢ় হয়। আইরিশের অভ্যন্তরে কম মেলানিন থাকলে চোখের রঙ হালকা বর্ণের তথা সবুজ, নীল ইত্যাদি হয়।

পৃথিবীর প্রায় ৫৫% মানুষের চোখের রং ই গাঢ় বাদামি। এর মধ্যে এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় সব মানুষের চোখের রঙই বাদামি। ধারণা করা হয় ১০,০০০ বছর পূর্বে পৃথিবীর সকল মানুষের চোখের রং বাদামি ছিল। কোন এক সময় আইরিশে পিগমেন্টেশনের রূপান্তর ঘটে এবং বিভিন্ন হালকা বর্ণের চোখের রঙের আবির্ভাব ঘটে। এ সম্পর্কে কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলুলার ও মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষণা প্রধান হ্যান্স আইবার্গ বলেন,

“মূলত আমাদের সবার চোখ একসময় বাদামি ছিল। তবে আমাদের ক্রোমোজোমে OCA2 জিনের মিউটেশন বা রূপান্তরের ফলে একটি সুইচ তৈরি হয় যা আক্ষরিক অর্থেই বাদামি চোখের উৎপাদনের পাশাপাশি ভিন্ন রঙের চোখ তৈরি করা শুরু করে।”

চলুন জেনে নেয়া যাক কোন রঙের চোখের পিগমেন্টেশনের মাত্রা কতোটুকু।

নীল চোখ : নীল চোখের মানুষদেরকে সচরাচর চোখে না পড়লেও তাদের দেখা পাওয়া কিন্তু একেবারেই অসম্ভব নয়। নীল চোখের সাথে ককেশীয় বংশগোত্রের একটি অদ্ভুত মিলবন্ধন রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের চোখের রঙের ভিত্তিতে পরিচালিত এক জরিপ থেকে পাওয়া তথ্যমতে দুই ধরনের মানুষের চোখের রঙ নীল হতে পারে।

সুদূর অতীত কোনো পূর্বপুরুষ থেকে জেনেটিক পরিবর্তনের ফসল হিসেবে।
দৃষ্টিজনিত কোনো চোখের রোগের (যেমন-অকুলার অ্যালবিনিজম) ফলে পিগমেন্ট পরিবর্তনের কারণে।

বিখ্যাত গায়িকা টেইলর সুইফটের “গর্জিয়াস” গানটি সহ আরো হাজারো গায়ক-গায়িকা, লেখক-লেখিকা তাদের সৃষ্টির মাঝে নীল চোখের আকর্ষণের কথা উল্লেখ করেন। নীল চোখকে এতোটাই আকর্ষণীয় ভাবা হয় যে কেবলমাত্র এই একটি কারণেই পৃথিবীতে অনেক ব্যক্তি সঙ্গী হিসেবে নীল চোখের অধিকারীদের বেছে নেন। অদ্ভুত হলেও সত্যি নীল রঙের চোখে কম মেলানিন উৎপন্ন হয়। ব্লু আইজ নিয়ে প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণা হলো নীল চোখে নীল রঙের পিগমেন্টেশন হয়ে থাকে, তবে ধারণাটি একদমই ভিত্তিহীন। মেলানিনের ঘাটতির কারণেই চোখের বর্ণ নীল দেখায় ৷ পৃথিবীতে কেবল ৮-১০% নীল চোখের মানুষ রয়েছে।

অ্যালবিনিজম কী?

অ্যালবিনিজম বা লিউসিজমকে বলা হয় জন্মগত রোগ। এই রোগে আক্রান্তদের চুল, চোখ, ত্বক বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে। আগেই বলেছি, আমাদের পিগমেন্ট সেলের কারণে আমরা স্বাভাবিক রংয়ের ত্বক, চোখ, দেহ পাই। এই পিগমেন্টের অভাবে হয় অ্যালবিনিজম। ফলে, এই রোগে আক্রান্ত মানুষরা কিছুটা ইউনিক রংয়ের চোখ বা ত্বকের অধিকারী হন।

অকুলার অ্যালবিনিজম

অ্যালবিনিজম দুই প্রকার, এর মধ্যে যে অ্যালবিনিজমের কারণে চোখের রং বদলে যায়, সেটাই অকুলার অ্যালবিনিজম। অকুলার অ্যালবিনিজমে মানুষের চোখের মণির রঙ সবুজ থেকে নীল এমনকি বাদামী রঙ ধারণ করতে পারে। এক্ষেত্রে খুব অল্প পরিমান পিগমেন্ট চোখে থাকে বলে আলো সরাসরি আইরিসে প্রতিফলিত হয়। যা তৈরি করে টিন্ড্যাল ইফেক্ট। বদলে যায় রং। বিজ্ঞান বলে, অকুলার অ্যালবিনিজম বংশানুক্রমে বিস্তার লাভ করে থাকে৷ পিতামাতার দুইজনই যদি অ্যালবিনিজম রোগের বাহক হয়ে থাকেন, তাহলে সন্তানেরও অ্যালবিনিজম হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

একটুখানি ইতিহাস

অকুলার অ্যালবিনিজম ছাড়াও চোখের রং নীল হতে পারে। কীভাবে? জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ধারার কারণে। আপনি যদি ইউরোপের মানুষদের দিকে তাকান, দেখবেন প্রচুর ভিন্নরংয়ের চোখসমৃদ্ধ মানুষ ঘুরছে চারদিকে। তারা কি সবাই রোগী? অবশ্যই না। এটা হয়েছে বংশানুক্রমিকভাবে। বিবর্তনের এক পর্যায়ে জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে যার সূত্রপাত, সেই ধারা অব্যাহত হচ্ছে অনেক সময় ধরে।

কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলে, চোখের রংয়ের এই বদলের উৎস খুঁজতে হলে ফিরতে হবে ১০ হাজার বছর আগে! বিজ্ঞানীরা বলছেন, আনুমানিক ৬ থেকে ১০ হাজার বছর পূর্বে জেনেটিক এক পরিবর্তন ঘটে এক জাতির মধ্যে। এই পরিবর্তন মেলানিন ও পিগমেন্টের উপরে হয় যা আমাদের ত্বক, চুল, চোখের রং নির্ধারণ করে। ক্রমোজমে থাকা OCA2 নামক একটি জিন বিবর্তনের কারণে চোখের রং নীল হতে শুরু করে। তার আগে পৃথিবীতে ছিল না কোনো নীল রংয়ের চোখ।

একটা ইন্টেরেস্টিং তথ্য গবেষণায় দাবি করা হয়। সেটা দিয়েই লেখাটি শেষ করি। গবেষণায় বলা হয়, যাদের চোখের রং নীল তাদের চোখের ডিএনএ প্রায় অনুরুপ, একই। অর্থাৎ, এই নীল চোখের মানুষগুলো সরাসরি সম্পর্কযুক্ত না হয়েও চোখের রংয়ের কারণে অলিখিত এক সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন নিজেদের অগোচরেই!

সবুজ: খুব অল্প সংখ্যক মানুষের চোখই সবুজ হয়ে থাকে। পৃথিবীর মাত্র ২% মানুষের সবুজ চোখ রয়েছে। বাদামি চোখের তুলনায় এদের মেলানিন উৎপাদনের পরিমাণ কম তবে নীল চোখের তুলনায় বেশি। আইরিশের কম মেলানিন উৎপাদনের কারণে এসব চোখে সূর্যের আলোর বিচ্ছুরণ হয় বেশি ফলে চোখ গুলোকে সবুজ বর্ণের দেখায়। আলোর তারতম্য ভেদে অবশ্য এসব চোখের রঙের পরিবর্তনও দেখা যায়।

হ্যাজেল: হ্যাজেল চোখকে প্রায়ই নীল বা সবুজ চোখ বলে ভুল করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এই ভুলের পেছনেও মেলানিনই দায়ী। বাদমি চোখের পর হ্যাজেল চোখেই সবচেয়ে বেশি মেলানিন এর দেখা মেলে। তবে সেটি আইরিশের বাইরের পরিধি অংশে বেশি থাকে এবং ভেতরের অংশে কম। অদ্ভুত এই কম্বিনেশনের জন্য এই চোখগুলো হয়ে থাকে সম্পূর্ণ ব্যাতিক্রম। আলোর তারতম্য ভেদে এর রঙেরও তারতম্য দেখা যায়। পৃথিবী জুড়ে ৫-৮% মানুষের হ্যাজেল চোখ রয়েছে।

অ্যাম্বার: এটি খুবই বিরল। সবুজ চোখের তুলনায়ও এই চোখের সংখ্যা কম। অ্যাম্বার চোখকে প্রায়শই নেকড়ে চোখের সাথে তুলনা করা হয়। গোল্ডিশ বা হালকা সোনালী বর্ণের এই চোখগুলোর গঠন প্রণালী সম্পর্কে কোন পরিষ্কার মতামত পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হয় পিওমেলানিন নামক রঞ্জকের অত্যাধিক পিগমেন্টেশনের জন্য এমন চোখের আবির্ভাব ঘটে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুরা উত্তরাধিকার সূত্রে চোখের রঙ পেয়ে থাকলেও এর ব্যতিক্রমও ঘটে থাকে। মেলানিন এর পিগমেন্টেশনের রূপান্তর ফলে দুজন ব্রাউন আইজড পিতা মাতার সন্তানের চোখ ও নীল বর্ণের হতে পারে।

চোখের রঙে মানুষ চেনা যায় কি?
যদিও ‘চোখের জলের হয়না কোনো রঙ’-তবুও, চোখের রঙ দেখে আপনি মানুষের চরিত্র ও স্বভাব সম্পর্কে বুঝতে পারবেন অনেকটাই। চারপাশে সাধারণত বাদামী ও কটা চোখের মানুষদেরই আমরা বেশি দেখতে পাই। নীল ও সবুজ রঙের চোখও খুঁজে পাওয়া যায়। তবে, এশীয়দের মধ্যে তা খুব কমই দেখা যায়।

আসুন চোখের রঙকে বিবেচনায় নিয়ে মানুষ চিনে নিই.

কালো চোখের মানুষ
যাদের চোখের রং কালো, তারা রাতের অন্ধকারের মতোই রহস্যময় এবং তাদের অনুভূতি অনেক গাঢ় হয়। তারা বিশ্বাসযোগ্য এবং অন্যের কথা গোপন রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তারা অনেক বেশি দায়িত্ব নিতে জানেন এবং বিশ্বস্ত প্রকৃতির হয়ে থাকেন। কঠোর পরিশ্রমী এবং আশাবাদী এই কালো চোখের মানুষ ভালো করেই জানে কীভাবে অন্যের চোখে নিজের ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করা সম্ভব।

নীল চোখের মানুষ
নীল চোখের মানুষ অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। এরা খুবই শান্তিপ্রিয় প্রকৃতির। এদের সম্পর্কগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। তারা অন্যকে সুখী করতে আন্তরিকতার সঙ্গে অনেক কিছু করতে পারে। তাদের আরো একটি ভালো দিক হলো, তারা প্রতিটি কাজ করার আগে গভীরভাবে চিন্তা করে।

বাদামি চোখের মানুষ
যাদের চোখের রং বাদামি তারা অনেক আকর্ষণীয়, আত্মবিশ্বাসী এবং সৃজনশীল প্রকৃতির হয়ে থাকে। যেহেতু তারা অনেক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এ কারণে মাঝে মাঝে অন্যের কাছে নিজেকে প্রকাশ করতে সদাপ্রতিজ্ঞ থাকে।

খয়েরি চোখের মানুষ
যাদের চোখের রং খয়েরি, তারা অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত, হাস্যোজ্জ্বল এবং অ্যাডভেঞ্চারাস প্রকৃতির হয়ে থাকে। তারা যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। তাদের সাহস অনেক বেশি থাকে কিন্তু গতানুগতিক ধারায় তারা খুব সহজেই বিরক্ত হয়ে যায়। তাদের সৌন্দর্য মানুষকে অনেক বেশি আকর্ষণ করে, কিন্তু তাদের সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয় না।

ছাইরঙা চোখের মানুষ
যাদের চোখ ছাইরঙা, তারা অনেক বেশি প্রভাবশালী, শক্তিশালী এবং ভদ্র প্রকৃতির হয়ে থাকে। তারা খুব কম রাগান্বিত হয় এবং যে কাজই করে তাতে নিজের পুরো আবেগ, শক্তিকে কাজে লাগায়। তারা প্রেম-ভালোবাসাকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিতে জানে। তাদের ভেতরের শক্তি, বিশ্লেষণমূলক চিন্তা এবং যৌক্তিকতার কারণে যেকোনো পরিস্থিতিকে তারা সামলে নিতে পারেন।

সবুজ চোখের মানুষ
যাদের চোখের রং সবুজ হয়ে থাকে, তারা অনেক বেশি বুদ্ধিমান, উৎসুক এবং জীবনটাকে উপভোগ করতে জানে। তারা যে কাজ করে তাতে অনেক বেশি মনোনিবেশ করে। তাদের চেহারায় অদ্ভুত একটা আকর্ষণ থাকে। তবে তাদের নেতিবাচক ধ্যান-ধারণার কারণে যেকোনো বিষয়ে খুব তাড়াতাড়ি হিংসাত্মক আচরণ করে থাকে।