এ বছরের একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নাম ঘোষণা করা হলো গতকাল। এবার বিশিষ্ট ৯ ব্যক্তি এবং একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হচ্ছে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এই রাষ্ট্রীয় পদক। এর মধ্যে পাঁচটি বিভাগে রয়েছে বিনোদন ও সংস্কৃতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম। চলচ্চিত্রে একুশে পদক পাচ্ছেন অভিনেত্রী ববিতা, সংগীতে (মরণোত্তর) আইয়ুব বাচ্চু, নাট্যকলায় ইসলাম উদ্দিন পালাকার, নৃত্যে অর্থী আহমেদ এবং প্রথমবারের মতো কোনো ব্যান্ড হিসেবে ওয়ারফেজ।
ববিতা। ছবি: সংগৃহীত
দেরিতে হলেও পেয়েছি, তাতেই আমি খুব খুশি
ববিতা, অভিনেত্রী
অভিনেত্রী ববিতা বছরের একটা বড় সময় দেশের বাইরে ছেলের সঙ্গে থাকেন। সময় কাটান ভাইদের সঙ্গেও। একুশে পদকপ্রাপ্তির খবর শুনে বেশ আনন্দিত তিনি। বিদেশ থেকে মোবাইল ফোনে ববিতা বলেন, ‘যেকোনো প্রাপ্তিই তো আনন্দের। আর সেটা যখন একুশে পদকের মতো রাষ্ট্রীয় পদক হয়, তখন তো আনন্দটা বহুগুণ বেড়ে যায়। আমার মনে হয় এই পদক হয়তো আরও আগেই পেতে পারতাম। অনেক দেরিতে হলেও একুশে পদক পেয়েছি, তাতেই আমি খুব খুশি। দেশবাসীর প্রতি, ভক্ত ও দর্শকদের প্রতি আমার অকৃত্রিম ভালোবাসা। কারণ তাঁদের কারণেই তো আমি আজকের ববিতা হতে পেরেছি। তাঁদের কারণেই আমার এই সম্মাননা।’
ইসলাম উদ্দিন পালাকার। ছবি: সংগৃহীত
আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ এক পুরস্কার পাচ্ছি
ইসলাম উদ্দিন পালাকার, সংগীতশিল্পী
শুরুটা হয়েছিল যাত্রাপালায় অভিনয় দিয়ে। এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নিজের এলাকা কিশোরগঞ্জে কুদ্দুস বয়াতির পরিবেশনা দেখে পালাগানের প্রতি মোহ জন্মে ইসলাম উদ্দিনের। সিদ্ধান্ত নেন পালাগান তাঁকে শিখতেই হবে। কুদ্দুস বয়াতিকে ওস্তাদ মেনে ১৭ বছর বয়সে পালাগানের নেশায় ঘর ছাড়েন ইসলাম উদ্দিন। ইসলাম উদ্দিনের পালাকার হয়ে ওঠার যাত্রা সেই থেকে শুরু। চার দশকের ক্যারিয়ারে পালাগান নিয়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছেন বিদেশেও। জনপ্রিয়তা পেলেও এখনো গ্রামেই থাকেন ইসলাম উদ্দিন পালাকার। সম্প্রতি গানের রেকর্ডিংয়ের জন্য এসেছেন ঢাকায়। গতকাল দুপুরে গান রেকর্ড করতে মহাখালী যাচ্ছিলেন। তখনই একুশে পদক পাওয়ার খবর পান। ইসলাম উদ্দিন পালাকার বলেন, ‘রেকর্ডিংয়ের জন্য মহাখালী নামার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পকলা থেকে ফোন করে জানানো হয়, আমি একুশে পদক পাচ্ছি। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ এক পুরস্কার পাচ্ছি। আমি ভাবতাম, আল্লাহ যদি আমাকে দয়া করত, যদি আমি একুশে পদক পাইতাম, তাইলে আমার জীবনটা ধন্য হতো। এত দিনে সে ইচ্ছা পূরণ হলো।’
আইয়ুব বাচ্চু। ছবি: সংগৃহীত
অনেক দিন পরে হলেও দেশ তাঁকে স্বীকৃতি দিল
ফেরদৌস আক্তার চন্দনা, আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ও আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান
দেশের রক সংগীতকে যাঁরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম আইয়ুব বাচ্চু। মৃত্যুর সাত বছর পর মরণোত্তর একুশে পদক পাচ্ছেন তিনি। এমন খবরে খুশি হলেও খানিকটা আক্ষেপও শোনা গেল আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনার কণ্ঠে। চন্দনা বলেন, ‘একুশে পদকপ্রাপ্তি নিয়ে বাচ্চুর প্রতিক্রিয়া আর আমার প্রতিক্রিয়া তো এক হবে না। উনি তো আর দুনিয়াতে নেই। তারপরও ভালো লাগল, অনেক দিন পরে হলেও দেশ তাঁকে স্বীকৃতি দিল। বাচ্চু বেঁচে থাকলে এই অনুভূতির কথা ভালো বলতে পারত। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মরে যাওয়ার পরেই আমাদের দেশে সম্মানিত করা হয়।’
চন্দনা আরও বলেন, ‘একুশে পদক তো বিশাল পাওয়া যেকোনো শিল্পীর জন্য। সেটা নিজ হাতে নিতে পারলে তাঁর অনুভূতি হয় অন্য রকম। সেই প্রাপ্তির অনুভূতিটা বাচ্চু নিজের মুখে বলে যেতে পারল না। তবে এটা নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। কারণ বাচ্চু জীবদ্দশায় পুরস্কার নিয়ে কখনো আফসোস করেনি। হয়তো হঠাৎ হঠাৎ বলত।’
শেখ মনিরুল আলম টিপু, দলপ্রধান, ওয়ারফেজ। ছবি: সংগৃহীত
এই প্রাপ্তি ব্যান্ড সংগীতের জন্য বড় সুখবর
শেখ মনিরুল আলম টিপু, দলপ্রধান, ওয়ারফেজ
ব্যান্ড ওয়ারফেজ যখন একুশে পদকপ্রাপ্তির খবর পেল, তখন তারা স্টেডিয়ামের মঞ্চে। খবরটি শুনেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ব্যান্ডের সবাই। দলপ্রধান টিপু আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘যখন ওয়ারফেজ ব্যান্ডের একুশে পদকপ্রাপ্তির খবর পেলাম, তখন আমরা মিরপুর জাতীয় স্টেডিয়ামে অদম্য বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি কাপের উদ্বোধনী আয়োজনের মঞ্চে। মঞ্চেই খবরটা সবার সঙ্গে শেয়ার করি। আমরা এতটাই আনন্দিত যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। আমার মনে হয়, এই প্রাপ্তি শুধু ওয়ারফেজের নয়, ওয়ারফেজের যত ভক্ত ও শ্রোতা আছেন তাঁদের সবার। প্রথমবার কোনো ব্যান্ড একুশে পদক পেল। এই প্রাপ্তি ব্যান্ড সংগীতের জন্য বড় এক সুখবর। আমাদের আরও ব্যান্ড আছে, যারা একুশে পদক বা স্বাধীনতা পদক পাওয়ার যোগ্য। সেই পথে ব্যান্ড সংগীতের যাত্রা শুরু হলো।’
অর্থী আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত
খবরটা শুনে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না
অর্থী আহমেদ, নৃত্যশিল্পী
একুশে পদকের মতো পুরস্কারের তালিকায় সাধারণত জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের নাম বেশি দেখা যায়। তাই একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকায় নিজের নাম দেখে অবাক হয়েছেন অর্থী আহমেদ। অর্থী বলেন, ‘খবরটা শুনে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কারণ আমি তো বয়সে অনেক ছোট। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি সিনিয়ররা এ ধরনের সম্মাননা পান। আর্ট ফর্মকে যেসব তরুণ ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চায়, এই পুরস্কার তাদের জন্য অনুপ্রেরণার হবে। নাচ করে, গান করে এ দেশে কিছু হবে না—এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে তারা যেন ভাবতে পারে, সততার সঙ্গে কাজ করলে দিন শেষে ভালোবাসা ও সম্মান দুটোই পাওয়া যায়। আমি সব সময় চেষ্টা করেছি নাচকে মানুষের ভালো থাকার, সুস্থ থাকার একটা মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। একুশে পদক আমার দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিল। আমার এই অর্জন উৎসর্গ করছি লুবনা মরিয়মকে। তিনিই আমাকে গড়ে তুলেছেন।’

