সরকারের কোনও তালিকায় নেই নাম, বঞ্চিত-অবহেলিত তারা
বাংলাদেশ

সরকারের কোনও তালিকায় নেই নাম, বঞ্চিত-অবহেলিত তারা

বাংলাদেশে বিভিন্ন অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর নাম সরকারি তালিকায় থাকলেও ‘চৌদালী সম্প্রদায়ের’ নাম নেই কোথাও। সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষাগতসহ সব দিক থেকে পিছিয়ে আছে তারা। এদেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর তালিকায় নাম না থাকায় সরকারি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনও তাদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলায় ‘চৌদালী সম্প্রদায়ের’ অন্তত ১০ হাজার লোকের বসবাস। বছরের পর বছর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় একপ্রকার অস্তিত্ব সংকটে আছেন তারা।

সদর উপজেলার বৈকারী ইউনিয়নের বলদিঘাটা সীমান্তের বেড়িবাঁধের ওপর বসে ছিলেন ষাটোর্ধ্ব আহমদ আলী চৌদালী। দৃষ্টি কাঁটাতারের ওপারে। নিজের সমাজ এবং পরিবার ব্যবস্থা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে আহমদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের গ্রামের নাম বলদিঘাটা, মানুষ ব্যঙ্গ করে বলে বলদঘাটা। কাজ চাইলে বলে, “তোরা আলাদা জাত”। আমরা মুসলমান। কিন্তু সমাজ আমাদের আলাদা করে রেখেছে। আমরা না বুঝি জাতি না বুঝি কোনও গোষ্ঠী। বর্তমানে শুধু টিকে থাকাই এখন আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।’

পরিচয় কী তাদের

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইদ্রিস আলী চৌদালীদের নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণা অনুযায়ী, সাতক্ষীরা সদরের বৈকারী ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া, কাথন্ডা, খলিলনগর, কুশখালীর ভাদড়া, ঘোনা ইউনিয়নের গাজীপুর, দেবহাটার পারুলিয়া ইউনিয়ন, কুলিয়া, হিজলদি ও চন্দনপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এই সম্প্রদায়ের ১০ হাজার মানুষের বসবাস। পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকায় তাদের বসতি রয়েছে। 

তবে চৌদালীদের আদি পরিচয় স্পষ্ট নয়। প্রচলিত আছে, তাদের পূর্বপুরুষ মাথায় ডালা নিয়ে মাছ বিক্রি করতেন। তাই ডালা সৈয়দ নামটি এসেছে। ধর্মীয়ভাবে মুসলিম হলেও একসময় তাদের ‘বাগদি’ বলা হতো। দীর্ঘদিন মাছ ধরাই ছিল প্রধান পেশা। কিন্তু জলাধার সংকটে অনেকে এখন কৃষিকাজ ও ইটভাটা শ্রমিকের কাজ করছেন। তাদের মধ্যে শিক্ষার হার খুবই কম। প্রাথমিকের গন্ডি পেরোনো শিক্ষার্থীও হাতেগোনা। নারীরা ঘরের কাজের পাশাপাশি মাছ ধরা ও কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তবে শিশু বয়স থেকে অনেকে মাছ ধরার কিংবা কাগজ কুড়ানোর কাজে জড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার মাটির ঘরে থাকে। সামান্য বসতভিটাই একমাত্র সম্পদ। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ বাড়লে এই অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। 

ইদ্রিস আলীর ভাষ্যমতে, তাদের একটি পৃথক সাংস্কৃতিক পরিচয় আছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় স্বীকৃতি না থাকায় উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে পড়ছেন তারা।

জেলা সমাজসেবা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, প্রান্তিক ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর তালিকায় ৫০টির বেশি গোষ্ঠীর নাম থাকলেও চৌদালীর নাম নেই। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির (ভাতা/সাহায্য) কোনও ধরনের সুফল পান না তারা। জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাদের কাছেও তাদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

কোথাও নাম নেই

সদরের বৈকারী ইউনিয়নের সাহেব আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পরিচয় পেলে স্থানীয় লোকজন আমাদের সঙ্গে মেশে না। কামার, কুমার, মুচি, কায়পুত্র, হরিজন সবাই তো সরকারের কোনও না কোনও তালিকায় থাকে। আমরা সবসময় তালিকার বাইরের মানুষ। কোথাও আমাদের নাম নেই। অথচ আমরা এদেশের নাগরিক এবং ভোটার। শুধু ভোটের সময় ভোট চাইতে আসেন জনপ্রতিনিধিরা।’

জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, চৌদালী নামে কোনও জনগোষ্ঠীর তথ্য আমাদের কাছে নেই। চৌদালীরা আদিবাসী কিংবা দলিত/বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কোনও তালিকায় না থাকায় অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে সরকারের কোনও সুবিধা পান না।

অবহেলিত জীবন

সাতক্ষীরায় কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, চৌদালীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা অনগ্রসর জনগোষ্ঠী। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, পরিচয় সংকট ও দারিদ্র্যের কারণে অস্তিত্ব সংকটে।

বৈকারী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ওজিয়ার রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাথন্ডা বাজারসংলগ্ন এলাকায় এক হাজারের বেশি চৌদালী সম্প্রদায়ের লোকজন থাকলেও কোনও অগ্রগতি নেই তাদের। আমি ছাড়া আমাদের সম্প্রদায়ের কেউ এসএসসি পাস করতে পারেনি। অধিকাংশ পরিবার মাটির ঘরে থাকে, যুবকদের মধ্যে মাদকের প্রবণতাও বাড়ছে। আসলে আমাদের নিয়ে কারও কোনও ভাবনা নেই।’

বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনও তাদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না

তিনি আরও বলেন, ‘ঋশিল্পীর দুটি স্কুল থাকলেও তৃতীয় শ্রেণির পর বেশিরভাগ শিশু কাজের খোঁজে ঝরে পড়ে। পরিচয়পত্রে বয়সের গরমিল থাকায় অনেকে বয়স্কভাতাও পান না। সামগ্রিকভাবে সরকারি সেবা ও উন্নয়ন এখনও আমাদের কাছে পৌঁছায়নি।’

বৈকারী ইউপির চেয়ারম্যান আবু মো. মোস্তফা কামাল জানান, তার ইউনিয়নে প্রায় তিন হাজার চৌদালী বসবাস করেন। যাদের অধিকাংশ জেলে কার্ড পেলেও কোনও বরাদ্দ নেই। কিছুই পান না তারা।

বঞ্চনার শিকার নারীরাও

বৈকারী ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া এলাকার বাসিন্দা সালমা বেগম বঞ্চনাময় জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্ম এই মাটির ঘরে, আর মৃত্যুও এখানে। অন্য মানুষরা আমাদের সঙ্গে মিশতে চায় না। তাই কোথাও কাজও জোটে না। পুরুষদের পাশাপাশি আমাদেরও কাজ করতে হয়, নইলে সংসার চলে না।’ 

সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র্যের কারণে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে হয় জানিয়ে সালমা বেগম বলেন, ‘গায়ের রংয়ের কারণে এবং আমাদের নিচু পেশার দোহাই দিয়ে অন্য জনগোষ্ঠী থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে না। ফলে বিয়ে কেবল আমাদের নিজেদের জনগোষ্ঠীর (যেমন বৈকারী, ঘোনা) মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।’

বর্তমানে মাছ ধরার পেশাও সংকটে পড়ায় জীবন ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজন আগে যেমন মাছ ধরে বেঁচে থাকতো, এখন আর পারে না। অনেকে কাজের সন্ধানে ভারতে চলে গেছে। আর যারা এখানে থাকে তাদের বেশিরভাগই ইটভাটায় কাজ করেন।’

সম্প্রদায়ের একমাত্র উচ্চশিক্ষিত জামাত আলী

চৌদালী জনগোষ্ঠী থেকে উল্লেখযোগ্য উচ্চশিক্ষিত জামাত আলী। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার ও রাজনীতি বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি সরকারি ব্যাংকে কর্মরত। সমীক্ষা অনুযায়ী, তার আগে বা পরে এই জনগোষ্ঠী থেকে আর কেউ এতদূর উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারেননি।

জামাত আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চৌদালীরা শিক্ষায় ও অর্থনীতিতে সবচেয়ে পিছিয়ে। আমাদের পূর্বপুরুষরা মাছ ধরে জীবিকা চালাতেন। সাতক্ষীরার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় ১০ হাজার চৌদালী থাকলেও উচ্চশিক্ষায় আমরা কার্যত অনুপস্থিত। দারিদ্র্য, পরিচয় সংকট ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাবে এখনও বহু পরিবার বঞ্চনার শিকার। কম বয়সে বিয়ে-বিশেষত মেয়েদের ১৩-১৪ বছরেই বিয়ে আমাদের সামাজিক বাস্তবতা।’

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় একপ্রকার অস্তিত্ব সংকটে আছেন তারা

শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণ ও ঋশিল্পীর উদ্যোগ

ঋশিল্পী ইন্টারন্যাশনালের জোসেফ খাঁ বলেন, ‘চৌদালী সম্প্রদায়ের পড়াশোনায় অনাগ্রহের মূল কারণ অভাব ও অসচেতনতা। শিশুরা মনে করে ছোট বয়সে অল্প শিক্ষা যথেষ্ট। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঋশিল্পী কমিউনিটি প্রাইমারি স্কুল পরিচালনা করছে, যা শিশুদের মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত করতে সাহায্য করছে। এ ছাড়া বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কর্মসূচির ফলে বিয়ের বয়স কিছুটা বেড়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে তারা অনেক পিছিয়ে।’

মানবাধিকারকর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, ‘চৌদালীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। স্বীকৃতি ছাড়া উন্নয়নই তাদের কাছে পৌঁছাবে না। বৈষম্য দূর করে তাদের মানবিক মর্যাদা দিতে হবে।’

সরকারের খাতায় নাম নেই

জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের উপপরিচালক সায়েদুর রহমান মৃধা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলার অসহায়, দলিত, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি সহায়তা ও ভাতা আছে। কিন্তু চৌদালী জাতিগোষ্ঠীর কোনও তালিকা আমাদের কাছে কিংবা সরকারের খাতায় নেই। তবে আগামীতে তাদের প্রান্তিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা, সে বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবো আমরা।’

Source link

Related posts

গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৫৩ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে

News Desk

৫ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর পদত্যাগে বাধ্য হলেন যশোর নার্সিং কলেজের ইনচার্জ

News Desk

মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে প্রাণ হারালেন মা

News Desk

Leave a Comment