Image default
বাংলাদেশ

কৃষকের ৭০ টাকার নতুন পেঁয়াজ বাজারে ১৫০, কারা বাড়াচ্ছে দাম?

পেঁয়াজ উৎপাদনের জেলা রাজশাহীর সবগুলো হাটবাজারে হঠাৎ বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। পুরোনো পেঁয়াজ ১৬০-১৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এরই মধ্যে বাজারে এসেছে নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ। এগুলো ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন কৃষকরা। অথচ ওই পেঁয়াজ খুচরা বাজারে এসে হয়ে যাচ্ছে ১৫০ টাকা।

কৃষকরা বলছেন, হাত বদলে নতুন পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের দাবি, বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তবে তাদের দাবির সঙ্গে বাস্তবে কোনও মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বাগমারা ও পবা উপজেলার কৃষকরা নতুন পেঁয়াজ ৭০-৮০ টাকা কেজিতে পাইকারদের কাছে বিক্রি করছেন। কেজিতে ১০-২০ টাকা বাড়িয়ে সেই পেঁয়াজ আড়তদারদের কাছে বিক্রি করছেন পাইকাররা। আরও ১০-২০ টাকা বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন আড়তদাররা। ব্যবসায়ীরা আরও ১০-২০ টাকা বাড়িয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন। সোমবার (১১ ডিসেম্বর) রাজশাহীর বাজারে নতুন পেঁয়াজ ১৫০-১৬০ টাকা কেজি দরে কিনেছেন খুচরা ক্রেতারা। এই দাম নিয়ে ক্ষুব্ধ তারা।

রাজশাহী জেলায় মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। এদের দৈনিক ৩০ গ্রাম করে পেঁয়াজের চাহিদা ধরা হয়। এতে জেলায় দৈনিক চাহিদা প্রায় ৯০ মেট্রিক টন। বছরে চাহিদা ৩২ হাজার ৮৫০ মেট্রিক টন। জেলায় উৎপাদন হয় চার লাখ ৩২ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। হিসাবে জেলার চাহিদার তুলনায় প্রায় চার লাখ টন বেশি উৎপাদন হয়। তারপরও সিন্ডিকেটের কারণে এখন ১৮০ টাকায় পুরোনো পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

রাজশাহী কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তিনটি মৌসুমে রাজশাহীতে ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে চার লাখ ৩২ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সাত হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে তাহেরপুরী জাতের মুড়িকাটা এক লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন, ১২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে তাহেরপুরী জাতের চারা পেঁয়াজ দুই লাখ ৬০ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন এবং এক হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন নাসিক এন-৫৩ জাতের ৩৫ হাজার ১০০ মেট্রিক টন।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোজদার হোসেন বলেন, ‘মুড়িকাটা ও নাসিক এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজ বাজারে উঠতে শুরু করেছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন নতুন পেঁয়াজ বাজারে এসেছে। আগামী দুই দিনে আরও সাত হাজার মেট্রিক টন বাজারে আনবেন কৃষকরা।’

হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা সময়ের আগেই পেঁয়াজ তুলছেন উল্লেখ করে মোজদার হোসেন বলেন, ‘তবে বাজারে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষকরা। মধ্যস্বত্বভোগী লাভবান হচ্ছে। দুই-একদিনের মধ্যে নতুন পেঁয়াজে বাজার ভরে যাবে। তখন দাম আরও কমবে। এর প্রভাব পড়বে কৃষকদের ওপর।’

জেলায় উদ্বৃত্ত থাকে তিন লাখ ৯২ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ জানিয়ে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘জেলার মানুষের বছরের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত পেঁয়াজ আমরা দেশের ১৬ কোটি ৮০ লাখ মানুষকে একদিন খাওয়াতে পারবো। এরপরও এখন সেই পেঁয়াজ ১৮০ টাকা কেজিতে কিনতে হয় ক্রেতাদের।’

কৃষি কর্মকর্তা মোজদার হোসেন বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে প্রণোদনার আওতায় গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় দুই গুণ বাড়িয়ে জেলার আট হাজার ৫০০ কৃষককে এক কেজি করে এন-৫৩ জাতের গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজ দেওয়া হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ কিছুটা কষ্টসাধ্য, তবে লাভজনক। কৃষকরা এর সুফল পাচ্ছেন। এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজ ছয়-সাতটিতে কেজি হয়, হিসাবে বিঘা প্রতি ১৫০-২০০ মণ ফলন পাওয়া যাচ্ছে। বিঘায় ১০০ মণ উৎপাদন এবং প্রতি মণের দাম তিন হাজার টাকা ধরলে, এ বছর প্রায় ৩৬০ কোটি টাকার পেঁয়াজ বিক্রি সম্ভব। অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে বাজারে যখন শীতকালীন পেঁয়াজের সরবরাহ কম থাকে, তখন এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজ মানুষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’

কৃষকরা বলছেন, হাত বদলে নতুন পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে

জেলা কৃষি অধিদফতর নতুন পেঁয়াজ উৎপাদনে সুসংবাদ দিলেও সিন্ডিকেটের কারণে অস্থির বাজার। যে সময়ে দাম সবচেয়ে কম থাকার কথা সে সময়ে দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষজন।

মঙ্গলবার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, জেলা ভোক্তা অধিদফতরের টিম দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত বাজার মনিটরিং করেছে। এ সময় পুরোনো পেঁয়াজের কেজি ১২০-১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। অভিযান শেষ না হতেই বেলা দেড়টার দিকে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১৮০ টাকায়। নতুন পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকায়।

এ বিষয়ে জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের অধিদফতরের কর্মকর্তা মো. মাসুম আলী বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট পেঁয়াজের বাজার অস্থির করে রেখেছে। অভিযান চালিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’

তিন বিঘা জমিতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ আবাদ করেছেন পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার নামোপাড়া গ্রামের চাষি শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এখন প্রতি কেজি ৭০ টাকায় বিক্রি করছি। পেঁয়াজের পাতার কেজি ২০ টাকায় বিক্রি করছি। এতেও বাজারে প্রভাব পড়ছে না। বেশি দামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। আমরা কিন্তু বেশি দাম পাচ্ছি না।’

একই কথা বলেছেন বাগমারা উপজেলার মাড়িয়া ইউনিয়নের কাঁঠালবাড়িয়া গ্রামের গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষি মামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে আবাদ করেছি। ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি।’

কৃষকরা নতুন পেঁয়াজ ৭০-৮০ টাকা কেজিতে পাইকারদের কাছে বিক্রি করছেন

রাজশাহীর মাস্টারপাড়া কাঁচাবাজার থেকে পাইকারিতে পেঁয়াজ কিনে ভ্যানে করে নগরীতে বিক্রি করছেন জমসেদ আলী। তিনি বলেন, ‘সোমবার পুরোনো পেঁয়াজ ১৬০ টাকায় কিনে বিক্রি করেছি ১৮০ টাকায়। নতুন পেঁয়াজ ১৩০ টাকা কেজিতে কিনে বিক্রি করেছি ১৪০ টাকায়। কেজিতে ১০-২০ টাকা লাভ করছি আমরা।’

মাস্টারপাড়া কাঁচাবাজারের আড়তদার হাসিবুল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. হাসিবুল ইসলাম বলেন, ‘সোমবার ১৫০ টাকা দরে কিনে ১৬০ টাকায় পাইকারিতে বিক্রি করেছি পুরোনো পেঁয়াজ। ১০০ টাকা কেজি দরে কিনে ১২০ টাকায় বিক্রি করেছি নতুন পেঁয়াজ। কিন্তু খুচরা বাজারে কেন দাম বেশি, তা আমার জানা নেই। পুরোনো এলসি পেঁয়াজ আজ ১৩০ টাকায় পাইকারিতে বিক্রি করেছি। নতুন পেঁয়াজ ১১০ টাকায় বিক্রি করেছি। বেশি দামে কেনায় আমাদের বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। তবে লাভ সীমিত আমাদের।’

নগরীর সাহেববাজার কাঁচাবাজারের খুচরা ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘পাইকারি ব্যবসায়ীরা মিথ্যা বলছেন। তারা কোনও পেঁয়াজ ১৫০ টাকার নিচে বিক্রি করছেন না। ১৫০-১৬০ টাকায় কিনতে হচ্ছে আমাদের। নতুন পেঁয়াজ কিনতে হয় ১৪০-১৫০ টাকায়। আর পুরোনো ১৬০ টাকায়। এই দামে কিনে এখন আমাদের কত দরে বিক্রি করতে হবে আপনারাই বলেন। অথচ বেশি দামে বিক্রি করলে আমাদের জরিমানা হয়। কিন্তু পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের জরিমানা করা হয় না।’

Source link

Related posts

শিমুলিয়া ফেরিঘাটে মোটরসাইকেলের চাপ

News Desk

রেল ব্রিজের নিচে পরেছিল যুবকের লাশ

News Desk

চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনায় কমেছে মৃত্যু ও শনাক্ত

News Desk

Leave a Comment